প্রথম পাতা > শিক্ষায় আইসিটির ব্যবহার > শিক্ষার্থী কেন্দ্রীক শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, চাই শিক্ষায় আইসিটির ব্যবহার

শিক্ষার্থী কেন্দ্রীক শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, চাই শিক্ষায় আইসিটির ব্যবহার


আপনি কি মনে করতে পারেন, কোন ক্লাসে পড়ার সময় প্রথম পরিসংখ্যান বিষয়টি সম্পর্কে প্রথম জেনেছেন বা শিখেছেন? আরও কি মনে করতে পারেন কিভাবে আপনাকে এ বিষয়টি প্রথম পাঠদান করা হয়েছিল?

আমার যতটুকু মনে পরে আমাদের সময় সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীতে ‘পরিসংখ্যান’ বলে কিছুর সাথে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। যথারীতি কি, কিভাবে করতে হয়, কি থাকে এগুলোর মুখস্ত করতে হয়। সাথে সাথে লেখচিত্র নামের কিছু আজব জিনিসের সাথে পরিচয়। সব মিলিয়ে মুখস্ত দিয়ে শুরু। আমার মনে পরে, আমি আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পরিসংখ্যানের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি, কারণ আমাকে বিষয়টি মুখস্ত করতে হয়েছিল এবং সময় মত ভুল গ্যায়া। অথচ চীনের বাচ্চাদের নাকি এই পরিসংখ্যান বিষয়টি প্রথম পাঠ দেওয়া হয় তাদের প্রথম শ্রেণী থেকেই। বাপরে! এ জিনিস এত ছোট বাচ্চারা কিভাবে পড়ে! এত কঠিন জিনিস তারা এতো ছোট বয়সে কিভাবে মুখস্ত করে!

আসলে ওরা মুখস্ত করে না, ওরা পরিসংখ্যান বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করে। প্রশ্ন আসতে পারে, এত ছোট বয়সে ওরা এ কঠিন জিনিস বোঝে কেমন করে? আসলে কঠিন ব্যপারটি কতটা সহজ এবং বোধগম্য হবে তা নির্ভর করে, বিষয়টি কিভাবে শিখানো এবং কিভাবে বাচ্চাদের সামনে উপস্থাপন হচ্ছে তার উপর। তাহলে চাইনিজ শিক্ষকগণ কি করেন?

চাইনিজ শিক্ষকরা যা করেন তা হল, তাদের নিজেদের জ্ঞান শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে না দিয়ে শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেন বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষা নেওয়ার জন্য। কিভাবে? প্রথমে শিক্ষক ক্লাশে শিক্ষার্থীদের তাদের পর্যায় অনুযায়ী মজার কোনো সমস্যা তুলে ধরেন। সেই সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে এবং খেলার ছলে তাদের এ বিষয়টি শিখানো হয়। উদাহরণ দেই, যেমন ধরুন, শিক্ষক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের বলছে, ধরো সামনে তোমার জন্মদিন। তুমি তোমার ক্লাসের সব বন্ধুদের জন্মদিকের পার্টিতে নিমন্ত্রণ দিয়েছো। তুমি জন্মদিনে খাবারের জন্য চার ধরনের কিছু ফল যেমন কলা, কমলা, আপেল, আম কিনে রেখেছো।  সবাই জন্মদিনে তোমার বাড়িতে এলো এবং যার যার পছন্দ মত ফল নিয়ে খেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো, কলা, আপেল, কমলার ঝুড়িতে ফলগুলো রয়েছে কিন্তু আমের ঝুড়িটি খালি হয়ে গেছে, এবং আম পছন্দ করে তোমার এমন কিছু বন্ধু  এখনও আম নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কেন এমন হলো, কি করলে এই সমস্যা হতো না? এ প্রশ্নটি সকল শিক্ষার্থীকে দেওয়া হল। তাদের চিন্তা করার সুযোগ দেওয়া হল এবং যা মনে আসে তাই উত্তর দিতে বলা হল, এক এক জন এক এক রকম দেয় যা স্বাভাবিক, এভাবে উত্তর দিতে দিতে, হয়তো কোনো একটি বাচ্চা সঠিক উত্তর বা কাছাকাছি উত্তর দিবে। উত্তরটি খুব কঠিন কিছু হবে না তা হতে পারে এমন, আমরা যদি আগে থেকেই জানতে পারতাম আমার কোন বন্ধুটি কি খেতে পছন্দ করে তাহলে আমি ঐ অনুযায়ী ফল কিনতে পারতাম, তাহলে আর এই সমস্যা হতো না।

শিক্ষক তখন শিক্ষার্থীদের বলবে, এসো আমরা একটি খেলা খেলি যার মাধ্যমে জানতে পারবো কোনো ফলটি তোমার কতজন বন্ধু পছন্দ করে। ক্লাসে থাকা ফলের ছবিগুলো শিক্ষক ক্লাসে থাকা বোর্ডের নিচে পাশা পাশি ঝুলিয়ে দিবেন। আর শিক্ষার্থীদের বলবেন ক্লাসে থাকা মানুষের ছবিগুলো প্রত্যেকে একটি করে নিতে, এবং যে ফলটি তার পছন্দ সে ফলের ছবির উপরে লাগিয়ে দিতে। পরের শিক্ষার্থীটিও ঠিক একই ভাবে ঐ ছবি উপরে লাগিয়ে দিবে। সবার ছবি লাগানো পর শিক্ষক প্রত্যেকটি ফলের উপরে লাগানো মানুষের ছবিগুলো গুনতে বলবেন। সবার শেষে শিক্ষক বোর্ডে একটি ছক তৈরি করবেন, যার প্রথম কলামের প্রতিটি সারিতে এক একটি ফলের ছবি লাগানো থাকবে আর পরের কলাম খালি থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের বলবেন তারা যে মানুষের ছবি গুণেছিল তা ছকের ফল অনুসারে পরে ঘরে লিখতে। ফলে কোনো ফল কতজন বন্ধু পছন্দ করে এই সমস্যাটি একটি বাস্তবিক সমাধান শিক্ষার্থীরা পেয়ে গেল। এরপর শিক্ষক তার লেকচারে পরিসংখ্যানের সাধারণ বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের তার লেকচারের মাধ্যমে জানালো। ব্যাস এভাবেই একটি বাচ্চা তার প্রথম পরিসংখ্যানের পাঠ নিলো।

এখন প্রশ্ন হল, এখান থেকে শিক্ষার্থীরা পরিসংখ্যানের কি শিখলো? বাচ্চারা প্রথমেই জানলো যে পরিসংখ্যানের ব্যবহার। যা দিয়ে কি ধরনের সমস্যার সমাধান তারা করতে পারে। বোর্ডে তারা মানুষের ছবি লাগিয়ে যে কাজটি করেছিলো, এর ফলে বোর্ডে তৈরি হয়েছিল একটি গ্রাফ/লেখচিত্র/চার্ট। আর শেষে ছবিগুলো গুণে ছকে ফেলার মাধ্যমে তাদের সমস্যার সমাধানটি সম্পূর্ণ হল। এখন আপনাদের কি মনে হচ্ছে, পরিসংখ্যানের পাঠকি তাদের কাছে মোটেও কঠিন ছিল?

এখন ভাবুন, এখানে শিক্ষকের কি ভূমিকা ছিল? ক্লাসের পরিবেশ কেমন ছিল আর ক্লাসে কি কি শিক্ষা উপরকরণ ছিল?

শিক্ষার্থীরা তাদের পুরো কাজ করার পূর্বে কখনই তিনি শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যান সম্পর্কে একটি কথাও বলেন নি। শিক্ষার্থীরাই নিজে নিজে বিষয়টি শিখেছে, শিক্ষক পুরো ব্যপারটির একজন সঞ্চালক হিসেবে কাজ করেছেন। ক্লাসে যা ছিল তা হল একটি ল্যাপটপ একটি প্রজেক্টর। যাতে একটি কার্টুন বা প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে পুরো সমস্যাটি শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বিশেষভাবে তৈরি কিছু ফলের এবং মানুষাকৃতির কার্ড। আর কার্ডগুলো লাগানোর জন্য একটি বিশেষভাবে তৈরি বোর্ড।

আমাদের সময়কার শিক্ষাদানের পদ্ধতি থেকে এখানে মাত্র দুটো জিনিসের পরিবর্তনের ফলেই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানার পরিধি কি পরিমানে বৃদ্ধি পাবে তা উপলব্ধি করতে এর চেয়ে বেশী কিছু বলার অবকাশ নেই বলে আমি মনে করি। শুধুমাত্র শিক্ষকের শিক্ষাদানের পদ্ধতি এবং শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে আইসিটির ব্যবহারেই আমরা সহজেই এ পরিবর্তন আনতে পারি। আমাদের শিক্ষার্থীদের সামনে কঠিন বিষয়গুলোও সহজ করে উপস্থাপন করতে পারি, যার ফলে তাদের শুধু শিক্ষকের লেকচার আর পাঠ্যবই মুখস্ত করতে হবে না। আমাদের শিক্ষার্থীরা স্বশিক্ষিতি এবং সুশিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠবে।

  1. সুজিত দাস
    অক্টোবর 18, 2009; 11:06 পুর্বাহ্ন এ

    ভাইয়া,
    ভালো আছেন নিশ্চয়ই। আমি গতকাল টাংগাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলায় পাড়াগ্রাম গ্রমের নিউ লাইফ একাডেমী কিন্ডার গার্টেন স্কুলে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকদের সাথে কথা বলছিলাম এই ছাত্রছাত্রীদের কিভাবে আইসিটি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া যায়। আমি আমার কিছু বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা তাদের সামনে তুলে ধরি, তারা এতে করে খবই আগ্রহী হয়ে উঠে। তারা আইসিটি ব্যবহারের মাধ্যমে যে শিক্ষা পদ্ধতি এ নিয়ে খুবই আগ্রহ প্রকাশ করে, আর এতে করে আমি ও প্রত্যাশী হয়ে উঠি কি করা যায় এ নিয়ে। আর আজই আপনার লেখা পেয়ে আমি খুবই আশান্বিত হযে উঠছি। । কিন্ডার গার্টেন টা ১০১০ সালের শুরুতেই আইসিটি ব্যবহার শুরু করার প্রত্যাশা করছে এবং সেমত তারা তৈরি হচ্ছে। আমি তাদের শুরু করার জন্য টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিচ্ছি। আপনি যদি একটু সময় দেন তো আমরা একবার বসতে পারি বিষয়গুলো নিয়ে। আমি আপনার সহযোগীতা প্রত্যাশা করছি।

    ধন্যবাদান্তে

    সুজিত দাস
    সেল: ০১৭১৬১৪০৭৩৬

    • অক্টোবর 19, 2009; 5:08 অপরাহ্ন এ

      সুজিদ দা,
      আমার অফিস এখন উত্তরাতে। উত্তরায় এলে আমার অফিসে আসতে পারেন। আর ইমেইলও করতে পারেন।

      বেলায়েত

  1. No trackbacks yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: