প্রথম পাতা > উইকিম্যানিয়া > গন্তব্য আর্জেন্টিনাঃ ভারতীয় দূতাবাসে অভিজ্ঞতাপূর্ব প্রস্তুতি

গন্তব্য আর্জেন্টিনাঃ ভারতীয় দূতাবাসে অভিজ্ঞতাপূর্ব প্রস্তুতি


এ লেখাটি লিখছি, নয়া দল্লীর ভাসান্ত বিহারে আর্জেন্টিনা দূতাবাসের সামনে পার্কে বসে। ঢাকায় ভারতের ভিসার জন্য আবেদন করতে মাত্র সময় রয়েছে ৩ দিন। ১৬, ১৭ এবং ১৮ শে আগস্ট তারিখ। এর মধ্যে আমাকে ভারতের ভিসা তুলতে হবে এবং ১৯ শে আগস্ট আমাকে নয়া দিল্লী পৌছে ঐ দিনই আর্জেন্টিনার ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।

ভারতের ভিসার জন্য কাগজপত্র এবং টাকা এন্ডোর্সমেন্ট কিছুই হয়নি। সিদ্ধান্ত নিলাম ১৬ তারিখে ভারতের জন্য টাকা এন্ডোর্স করাবো। জানতে পারলাম ভারতের ভিসা পেতে অবশ্যই তাদের নির্ধারিত কিছু ব্যাংক থেকে টাকা এন্ডোর্স করাতে হবে। আর এর মধ্যে সবচেয়ে ভাল হয় যদি তা স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার মতিঝিল শাখা থেকে করা যায়। এদিকে এন্ডোর্সমেন্ট এবং ভিসার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনী কনফারেন্সের আয়োজকদের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পত্র, হোটেল বুকিং এর কাগজপত্র প্যাট্রিসিও ইমেইল করে দিয়েছে। অন্য দিকে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের সারার করা বুকিং এর ই-টিকিটের কপি এজেন্সি ওয়ালারা আমাকে ইমেইল করে দিয়েছে। এ কাগজপত্র গুলো সহ, বেশ কিছু টাকা নিয়ে মতিঝিল গেলাম। টাকা গুলো গুছোতে একটু সময় লেগে গেলো ফলে ব্যাংকে পৌছালাম দুপুর ১২ টা ৪৫ এ। যেয়ে দেখি বিশাল এক লাইন ব্যাংকের সামনে। এবং সবার হাতেই একটি টোকেন দেওয়া। জানলাম টোকেন নাকি ভিতর থেকে দেওয়া হয়। এখন আর দিবে কিনা তা কেউ বলতে পারছেন না। আমার সঙ্গে আমার এক ভাই ছিল, ওনাকে বললাম ভিতরে যেয়ে দেখে আসতে আমি লাইনে আছি। তিনি ভিতরে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ পরে বেড়িয়ে এলেন। এসে বললেন অনেক অনুরোধ করে একটি টোকেন তিনি যোগার করেছেন, টোকেন নম্বর হল ১০০। আবারও লাইনে দাড়ালাম। ব্যাংকের গেটে দাঁড়ানো গার্ড ৫ থেকে ৭ জন করে একবারে ব্যংকের গেট দিয়ে ডুকাচ্ছে। দেখতে দেখতে দুপুরের খাবারের সময় চলে এলো কিন্তু আমরা গেটের বাইরে রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মনে হতে লাগলো এই বুঝি ভারতের ভিসা তোলার সংগ্রাম শুরু হলো। এবং শুরু অভিজ্ঞতাই তা বলছে তা আগামীতে কতদূর এসে দাঁড়াবে তা আর বুঝতে বাকি রইলো না। মনে মনে চিন্তা করলাম, সংগ্রাম যখন শুরু করেছি এর শেষ না দেখে আর হাল ছাড়বো না। মানসিক এবং শারিরিক ভাবে প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। অবশেষ বিকাল ৩.৩০ এ ব্যাংকের ভিতরে ঢুকার সৌভাগ্য হল। সেখানে আমাকে একটি ফরম দেওয়া হল পূরণ করার জন্য। ফরম পূরণ করে জমা দিতেই সেখানকার লোক বললো কাজ এখনও বাকি আছে। এটি জমা দিলে ভিতর থেকে আমাকে ভাউচার দিবে এবং ভাউচার জমা দিলেই কেবল আমাকে টাকা এন্ডোর্স করতে দেওয়া হবে। আমাকে জানানো হল ব্যাংকে ডলার শেষ হয়ে গেছে আমাকে ইউরো কিনতে হবে। আমি যেহেতু ভারত হয়ে আর্জেন্টিনা যাবো তাই ৭০০ ইউরো চেয়ে ফরম পূরণ করেছিলাম। ফরম জমা দিতে গিয়েই, আমাকে জানানো হল দেরি হবে। সময় হলে ওনারাই আমাকে ডাকবেন। বসতে দেওয়া হল। সেখানেও প্রায় এক ঘন্টা বসে রইলাম। এর পর ফরম জমা নেওয়া হল। ফরম জমা নেওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যেই  আমাকে ডাকা হল। ব্যাংকার যিনি কাগজপত্র পরীক্ষা করে ভাউচার দিচ্ছিলেন আমার ফরম দেখে রীতিমত চিৎকার দিয়ে উঠলেন, “কার এমন মাথা খারাপ হয়েছে যে ৭০০ ইউরো চাইছে”। আমার আওয়াজ দেওয়াতেই উনি জানালেন, ৭০০ ইউরোতো কোনোভাবেই নয়। আমাকে ১১০ উইরোর বেশি দেওয়া হবে না। অনেক অনুরোধের পরে উনি ১৫০ উইরো লিখে দিলেন এবং জানালেন এর বেশি এখান থেকে দেওয়া হয় না। বেশির দরকার হলে ভারতের ভিসা নিয়ে এখানে আসতে, তখন তারা ডলার বা ইউরো দিবেন না, ওনারা ট্রাভেলার চেক ইস্যু করে দিবেন। আমি কিছুটা হতাশ কারণ আর সময় কই! তারপরেও ১৫০ ইউরোই নিলাম। ভাউচার নিয়ে আরেক টেবিলে জমা দিয়ে সেখান থেকে সিল লাগিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে জমা দিয়ে ১৫০ ইউরো কিনে নিলাম। ক্যাশ কাউন্টার থেকে একটি টোকেন দেওয়া হল। এটি আরেক টেবিলে জমা দিতে বলা হল। ঐ টেবিল থেকে জানানো হল পাসপোর্টের যে পাতায় এন্ডোর্স করা হয়েছে সে পাতাটি সহ এককপি ফটোকপি লাগবে। এটি দিলেই তারা আমাকে এন্ডোর্সমেন্টের সার্টিফিকেট দিবেন। ফটোকপি জমা দিলাম। সার্টিফিকেটও পেলাম। কিন্তু ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম, সন্ধ্যা ৬ টা বাজে। এর মানে আজকে আর কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এন্ডোর্সমেন্ট হয়ে গেলে  আজকে রাতেই মানে ১৬ তারিখ রাতেই ভারতের ভিসার জন্য লাইনে দাড়াবো।

সন্ধ্যায় বাসায় এসে চিন্তা করতে লাগলাম কাউকে সঙ্গী করা যায় কিনা! দুলাভাই, ছোট মামা কেউই যেতে রাজি নয় এই বলে যে তাদের একজন পরবর্তী দিন কাজে ব্যস্ত আর অন্যজন বললেন যে উনি ভারতীয় দূতাবাস চেনেন না। তবে ছোট মামা পরামর্শ দিলেন যে আমার সেজ মামাকে নিয়ে যেতে। কারণ সেজ মামা এর আগেও দু’বার ভিসার জন্য দাড়িয়েছেন। সেজ মামাকে ফোন দিলাম, মামা রাজি হয়ে গেলেন। মামাকে বললাম রাতে আমাদের বাসায় চলে আসেন এর পর রাত দু’টোয় দুজন চলে যাবো। মামা রাত ৮ টার দিকে চলে এলেন আর কাপড় বদলে শুয়ে পড়লেন বললেন সময় হলে ডেকে দিতে। আমিও গোসল টোসল করে তৈরি, মনে হচ্ছে কোনো এক তীর্থে যাত্রা করেছি। অভিজ্ঞদের কাছ থেকে জেনেছিলাম যে পাসপোর্টে যে জীবিকা লেখা থাকে তা ভিসার ফরমের সাথে অন্যান্য কাগজপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। আমি ছাত্র অবস্থায় পাসপোর্ট করেছিলাম এর পরে আর জীবিকা পরিবর্তন করিনি। ফলে পাসপোর্টে আমার জীবিকা বা প্রফেশন ছাত্র থাকলেও বর্তমানে আমি কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী নই। আবারও ঝামেলায় পড়লাম। দুলাভাই পরামর্শ দিলেন কনসুলার বরাবর একটি আবেদনপত্র বা প্রেয়ার লিখতে। যাতে আমার বর্তমান অবস্থান পরিস্কার করে বলা থাকে। দুলাভাই বললেন প্রেয়ারে অনেক সময় রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করে।

ভিসার জন্য কাগজপত্র গুছাতে শুরু করলাম। যা যা সাথে নিলাম তা হল,

  • পাসপোর্টের ফটকপি
  • পাসপোর্ট
  • পাসপোর্ট সাইজের ছবি
  • স্থানীয় কমিশনারের কাছ থেকে সনদ
  • জাতীয় পরিচয় পত্র
  • চাকুরীর সদন
  • ঢাকার বাড়ীর বিদ্যুৎ বিলের কাগজ
  • কনফারেন্সের আয়োজকের কাছ থেকে পাওয়া আমন্ত্রণ পত্র
  • আর্জেন্টিনায় হোটেল বুকিং এর প্রমাণপত্র
  • ভ্রমনের ই-টিকিটের কপি
  • প্রেয়ারের কাগজ

এছাড়াও আরও যা সাথে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখলাম তা হল,

  • কলম
  • স্টেপলার
  • দূতাবাসের সামনে বসার জন্য পুরনো খবরের কাগজ
  • একটি চাদর
  • খাবার জন্য যথেষ্ট পানি
  • দুটো ছাতা
  • কাগজপত্র এবং অন্যান্য জিনিস নেওয়ার জন্য একটি ব্যাগ

দুটোর দিকে মামাকে ডেকে তুললাম। এতো রাতে সূত্রাপুর থেকে গুলশান ১ এ কিভাবে যাবো তা নিয়ে ভাবনা শুরু হল। আব্বাকে বলতেই আব্বা পরিচিত একটি গাড়ি ঠিক করে দিলো। মামাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। পরের পর্বে পড়বেন সেই বহু কাঙ্খিত অভিজ্ঞতার কথা।

  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: