প্রথম পাতা > অজানা > গন্তব্য আর্জেন্টিনাঃ পাইনা রাস্তা খুজিয়া

গন্তব্য আর্জেন্টিনাঃ পাইনা রাস্তা খুজিয়া


বাংলা উইকিপিডিয়াসহ উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের বেশ কিছু প্রকল্পে অনেক দিন যাবৎ স্বেচ্ছাসেবা দেওয়াতে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের সাথে জড়িত অনেকের সাথেই পরিচয় হয়েছে। এদের মধ্যে ক্যারি বাজ (উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের ভলান্টিয়ার কোর্ডিনেটর), এবং সারা ক্রুজ (যিনি উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের পার্টনারশিপ ম্যানেজার) অন্যতম। এর আগেও আমি ২০০৭ এ উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের বার্ষিক সম্মেলন “উইকিম্যানিয়া” তে অংশ নিয়েছি। এ বছর ২০০৯-এ ক্যারি আবারও আমাকে “উইকিম্যানিয়া” তে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানায়। রেজিষ্ট্রেশনের তারিখ শেষ হয়ে জাওয়ার পরেই ক্যারির তাগিদে উইকিম্যানিয়ার জন্য রেজিষ্ট্রেশন করি।  ওরা জানায় আমার যাতায়াত খরচ আয়োজক বহন করবে। আমার সম্মতিতে ওরা আমার জন্য আর্জেন্টিনা যাওয়ার রাস্তা খুজতে থাকে।

এদিকে আমি আর্জেন্টিনার ভিসা কোথায় থেকে নিবো তার খোঁজ খবর নিচ্ছি। খোঁজ করার পর জানতে পারলাম। আমাদের ছোট দেশটিতে আর্জেন্টিনার মত বড় দেশের কোনো দূতাবাস নাই। আমাকে আর্জেন্টিনার ভিসা নিতে হবে, নিকটবর্তী দেশ ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লী থেকে। এর মধ্যেই ক্যারি আমাকে একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা পাঠিয়ে দিলো। তাতে রয়েছে ঢাকা থেকে কাতার থেকে স্পেইনের মাদ্রিদ হয়ে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ারসের ভ্রমণ পরিকল্পনা। এটা দেখে আমার মাথায় চিন্তা, আমার যে আর্জেন্টিনা যেতে ভারত যেতে হবে সে খরচ বহন করবে কে? আর যেই খরচ যেই বহন করুক না কেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতের ভিসার তোলার যে হ্যাপার কথা শুনেছি, তা কিভাবে  সামাল দিবো? মন খারাপ ভারতের ভিসা তুলতে যে কষ্ট মনে হচ্ছে তা আর্জেন্টিনা যাওয়ার আনন্দকে মাটি করে দিবে। এ কথা চিন্তা করে আর্জেন্টিনা যেতে ইচ্ছা করছে না। উইকিম্যানিয়ার প্রোগ্রাম সিডিউল দেখতে গিয়ে দেখলাম এবারের উইকিম্যানিয়াতে ফ্রি সফটওয়্যারের জনক রিচার্ড স্টলম্যান কি স্পিচ দিবে। একদিকে ভারতের ভিসা তোলার ভয় অন্য দিকে অনেক দিন ফ্রি সফটওয়্যার এবং ওপেন সোর্স সফটওয়্যারকে সমর্থন এবং এর দর্শন প্রচারে জড়িত থাকাতে রিচার্ড স্টলম্যানকে কাছ থেকে দেখার বিশাল সুযোগের হাতছানি। উফফ্‌ কিছুই ভাল লাগে না।

ক্যারিকে ইমেইলে জানালাম, ভাই আমি ভারত যেতে পারবো না, ভারত যেতে আমাকে কষ্ট, টাকা এবং সময় সবকিছুই দরকার এবং এগুলোর দাম টাকায় হিসেব করলে বেশ ভাল অংকেই দাঁড়াবে। তাই বিকল্প হিসেবে আমাকে আর্জেন্টিনার পোর্ট এন্ট্রি ভিসা বা অন এরাইভাল ভিসার ব্যবস্থা করে দাও। ক্যারিও বললো হ্যা এটাতো অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, সে আমাকে ইমেইলের উত্তর দিলো উইকিম্যানিয়ার স্থানীয় আয়োজক উইকিমিডিয়া আর্জেন্টিনা চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিসিও লরেন্টকে সিসি দিয়ে। প্যাট্রিসিও লরেন্ট সাথে সাথে উত্তর দিলো এবং আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করবে তা জানিয়ে সময় চাইলো। এর মধ্যে বেশ কিছু দিন চলে গেল। আবারও প্যাট্রিসিওকে ইমেইল দিলাম, এবার প্যাট্রিসিও জানালো যে আর্জেন্টিনার পোর্ট এন্ট্রি ভিসার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে আমার যেখানে যেখানে ট্রানজিট আছে সেখানে যদি আর্জেন্টিনার দূতাবাস থাকে তাহলে সেখান থেকে ভিসা তুলতে পারবো। আমি আমার ভ্রমণ পরিকল্পনা প্যাট্রিসিওকে পাঠালাম। সে উত্তর দিলো স্পেইনের মাদ্রিদে ৫ ঘন্টা ট্রানজিট কালে অবস্থানের সময় মাদ্রিদ এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে গিয়ে মাদ্রিদ শহরে অবস্থিত আর্জেন্টিনার দূতাবাস থেকে ভিসা সংগ্রহ করতে পারবো।  কাগজপত্র জমা দেওয়ার সাথে সাথে এবং প্রয়োজনী আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই সাথে সাথে তারা আমাকে ভিসা দিয়ে দিবে। তবে এর জন্য আমাকে স্পেইনের ট্রানজিট ভিসা সংগ্রহ করতে হবে।

আমি খোঁজ নেওয়া শুরু করলাম এখন স্পেইনের ভিসা কোথায় পাবো! মনে পড়লো স্বনামধন্য ফটোগ্রাফার মুনিরা মোরশেদ মুন্নির (ওনার অন্য পরিচয়গুলো লিখতে গেলে আরও একটি লেখা লিখতে হবে) কথা, যাকে আমি মুন্নি আপু বলে ডাকি এবং প্রচন্ড রকম শ্রদ্ধা করি। মুন্নি আপা কিছু দিন আগে স্পেইনে গিয়েছিলেন আমি তা জানতাম। তার কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়া যাবে এ আশায় তাকে ইমেইল করি। আপু বিশাল এক আশ্চর্যবোধক (স্পেইনের ভিসা নিতে হবে!!!!) থিমে একটি উত্তর দিলেন এবং জানালেন উনি বাংলাদেশের ফ্রেঞ্চ দূতাবাস থেকে ভিসা ফরম এবং ভিসা সংগ্রহ করেছেন এবং আরও পরামর্শ দিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভিসা ফরম সংগ্রহ করে তা জমা দিয়ে সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে। আমি সাথে সাথে ফ্রেঞ্চ দূতাবাসে ইমেইল করলাম আমার অবস্থা জানিয়ে, সাথে ইমেইলের সিসি দিলাম প্যাট্রিসিও এবং ক্যারিকে। এদিকে ক্যারি জানালো মাদ্রিদ থেকে ভিসা না তুললেও হয়তো আমাকে স্পেইনের ভিসা নিতে হতে পারে।

এদিকে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ভারতের নয়া দিল্লীতে অবস্থিত আর্জেন্টিনার দূতাবাসে আমার জন্য বার্তা পৌছে গেল। এবং তাদের বলা হল আমাকে ফোনে জানিয়ে দিতে যে আমি মাদ্রিদ থেকে ভিসা সংগ্রহ করতে পারবো।  এক দুপুরে আমার মোবাইল ফোনে একটি অপরিচিত এবং ভিন্ন ধরনের একটি নম্বর থেকে ফোন এলো ফোন রিসিভ করাতে অপর প্রান্ত থেকে জানালো যে প্রেম সিং নামে এক ভদ্রলোক যিনি নয়া দিল্লীতে অবস্থিত আর্জেন্টিনার দূতাবাসে ভিসা অফিসার পদে চাকুরী করেন এবং তিনি আমাকে স্পেইন থেকে ভিসা তোলার খবরটি জানালেন। অন্যদিকে ফ্রেঞ্চ দূতাবাস থেকে কোন উত্তর পেলাম না। প্রেম সিং ব্যক্তিগত ভাবে পরামর্শ দিলো, যেকোনো স্পেইন দূতাবাসই, গন্তব্য রাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার আগে আমার মত বাংলাদেশীকে স্পেইনের ট্রানজিট ভিসা দিবে না। তাছাড়া মাত্র ৫ ঘন্টার ট্রানজিটে এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে, অচেনা ভিন দেশী শহরে আর্জেন্টিনার দূতাবাস খুঁজে সেখানে ভিসার জন্য আবেদন করে, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আবার বিমান বন্দরে এসে পরবর্তী বিমান ধরা কারও পক্ষেই সম্ভব না। এর চেয়ে নয়া দিল্লী থেকে ভিসা সংগ্রহ করা আমার জন্য অনেক সহজ এবং সুবিধাজনক হবে। তিনি আরও জানালেন আমি নয়া দিল্লীতে আবেদন করলে তিনি ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভিসা পক্রিয়া করার যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। তবে তিনি এও বললেন যে স্পেইনে আবেদন করার সাথে সাথেই আমাকে ভিসা দিয়ে দেওয়া হবে।

খোঁজ নিয়ে জানলাম। সাধারণ বাংলাদেশীদের স্পেইনের ভিসা বাংলাদেশ অবস্থিত ফ্রেঞ্চ দূতাবাস ইস্যু করেন না, এখানে যারা সাংহেই নামক বিশেষ পাসপোর্টের অধিকারী শুধু তাদের ভিসা ইস্যু করেন। মাথা খারাপ হওয়ার যোগার। আবারও সেই ভারত গমন। এখন এমন দাড়ালো উইকিম্যানিয়াতে যাওয়ার জন্যে এখন ভারত, স্পেইন, আর্জেন্টিনা তিন দেশের ভিসা নিতে হবে। মাথা খারাপ হওয়ার যোগার। ভারতের নয়া দিল্লী থেকে দুই দেশের শুধু ভিসা নিতেই কম পক্ষে এক সপ্তাহ লেগে যাবে। নয়া দিল্লী যাওয়া ঢাকা ফেরত আসা সব মিলিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ। এতো সময় আর এত দিন আত ভারতে থাকার খরচ এ কথা চিন্তা করেই, আর্জেন্টিনা যাওয়ার কথা বাদ দেওয়া চিন্তা করছিলাম। এদিকে দুই সপ্তাহ সময়ও ছিল না। আর ভারতী ভিসা তোলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার হাতছানি তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে আশা ছেড়ে দিলাম। ক্যারি এবং সারাকেও জানিয়ে দিলাম অন্য কোনো রাস্তা যদি না থাকে তাহলে এ বারের মত আমাকে বাদ দিতে। সারা জানালো আগামীকাল সে জানাবে কিভাবে সব কিছু বাতিল করা যাবে তার পক্রিয়া। আর আরও জানালো এর মধ্যে যদি আমি অন্য কোনো রাস্তা খুঁজে পাই যেখানে ভিসার সমস্যায় পড়তে হবে না তাহলে তারা আমার আগের টিকিট বাতিল করে নতুন করে টিকিট করে দিবে।

এরই মধ্যে ভারতীয় বন্ধু আনিরুধের সাথে কথা হল, ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল ২০০৭ এর উইকিম্যানিয়াতে। সেও এবার উইকিম্যানিয়াতে যাচ্ছে। ভারত উপমহাদেশীয় হওয়াতে সেও একই ধরনের ভিসার সমস্যা পরেছে এবং সে জানালো সে এখন অন্য একটি রাস্তা দিয়ে আর্জেন্টিনা যাচ্ছে যে রাস্তায় ইউরোপকে উপেক্ষা করা যাবে এবং একাধিক দেশের ভিসা নিতে হবে না। ক্যারির কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আনিরুধ আমাকে পরামর্শ দিলো আমি যেন দুবাই থেকে ব্রাজিল হয়ে আর্জেন্টিনার টিকিট বুকিং দেওয়ার কথা বলি। আমি চট জলদি সারা আর ক্যারিকে এ রাস্তাটির কথা জানিয়ে ইমেইল করলাম। আরও বললাম যেহেতু সময় কম তাই যেন ওরা আমার ফ্লাইট ঢাকা থেকে দিল্লী  এবং দিল্লী থেকে দুবাই হয়ে ব্রাজিল হয়ে আর্জেন্টিনা করে দেয়। যেন দিল্লী থেকে ঢাকা ফেরত আসতে না হয়, ভিসা নেওয়ার পর সরাসরি দিল্লী থেকেই বুয়েনস আয়ারসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে পারি। এবং আরও বললাম ঢাকা থেকে দিল্লী এবং দিল্লী থেকে দুবাইয়ের ফ্লাইটের মাঝে যেন অন্তত তিন দিন থাকে, যে তিন দিনে আমি নয়া দিল্লী থেকে আর্জেন্টিনার ভিসা নিতে পারবো। পরের দিন সকালে সারা আমাকে নতুন একটি ভ্রমন পরিকল্পনা ইমেইলে পাঠালো। আরও বললো যদি এ রাস্তাটি আমার পছন্দ হয় তাহলে আজকের মধ্যেই জানাতে। তাহলে সে আমাকে টিকিট বুকিং দিয়ে দিবে। আমি ভ্রমন পরিকল্পনাটি খুললাম, যা ছিল আমার চাহিদা অনুযায়ী হুবুহু একটি ভ্রমন পরিকল্পনা। আমার দিল্লীর ফ্লাইট ১৯ শে আগস্ট তারিখে, দুবাইর ফ্লাইট ২৪শে আগস্ট। এর মধ্যে ২২ এবং ২৩ তারিখ শনিবার এবং রবিবার যে দিন সাড়া ভারতেই সপ্তাহান্তের ছুটি। আমি তড়িৎ সারাকে ইমেইল করলাম। সারা পরের দিন উত্তরে জানালো আমার আসল টিকিট আসবে না তারা আমাকে টিকিট বুকিং দিয়ে দিয়েছে এবং ই-টিকিট এক দিনের মধ্যে ট্রাভেল এজেন্সি থেকে আমাকে ইমেইল করবে। ঠিকই পরের দিন টিকিট পাঠিয়েছে। উইকিম্যানিয়া ছিল ২৬শে আগস্ট। আমাকে টিকিট দেওয়া হল ১২ ই আগস্ট। ১৩ই আগস্ট জন্মাষ্টমীর বন্ধ, ১৪ তারিখ শুক্রবার, ১৫ই আগস্ট মহান জাতীয় শোক দিবস। মাথা চক্কর দিতে লাগলো ১৬, ১৭, ১৮ এই তিন দিনে আমি কিভাবে সব কাগজপত্র গুছিয়ে ঢাকায় ভারতের ভিসার জন্য দাড়াবো। আবার কিভাবে ১৯ তারিখে নয়া দিল্লী গিয়ে ভিসার আবেদনের জন্য কাগজপত্র গুছাবো? রাস্তা খুঁজে পেয়েছি ঠিকই সাথে দেখা দিয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ।

পরের পর্বে জানতে পারবেন তারপর কি হল।

বিভাগ:অজানা
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: